Tuesday, April 4, 2017

#The_Illusion_and_Delusion...


১.....
হাত ভেঙে ঘরে বসে থাকা কোনো কাজের কথা না।আপাতত সেটাই করতে হচ্ছে।সকাল সকাল উঠে একটু পড়তে চাইলাম, কনসেনট্রেট করতে পারলাম না।মনকে ডাইভার্ট করতে ইউটিউবে "The Amazon Tribe" লিখে সার্চ দিলাম....
অদ্ভুত অদ্ভুত সব ভিডিও দেখছি।আমাজন জঙ্গলের গভীরে এক উপজাতি বাস করে যাদের সাথে বহির্বিশ্বের কোনো যোগাযোগ নেই, প্লেন থেকে ভিডিও করে তাদের দেখানো হচ্ছে।উপজাতিগুলো প্লেনের দিকে বর্শা/তীর ছুঁড়ছে।যারা ভিডিও করছেন তারা ডিসিশন নিয়েছেন যে এই উপজাতিটির সাথে তারা কোনো Contact করবেন না, যেহেতু উপজাতিটির সাথে হাজার হাজার বছর ধরে আমাদের যোগাযোগ নেই কাজেই আমাদের সংস্পর্শে কমন ফ্লু রোগেই এরা সবাই মারা যেতে পারে, কমন ফ্লু প্রতিরোধ করার মত ক্ষমতা এদের নেই বলেই ধারণা করা হচ্ছে .....
হাবিজাবি এইসব ভিডিও দেখে সকাল ৭ টায় ফ্ল্যাটের নীচে নেমেছি পেইনকিলার কেনার জন্য।এমন সময় এক মধ্যবয়সী লোক আমার সামনে এসে দাঁড়ালো....
--স্লামালিকুম স্যার...
--ওয়াআলাইকুমুসসালাম...
--স্যার, আমি এই ফ্ল্যাটেরই রশীদ স্যারের গাড়ি চালাই....
--ওহ আচ্ছা, কি ব্যাপার?....
--এই লিস্টটা একটু দেইখা আমারে বলেন তো স্যার-কোন্ কোন্ বই না কিনলেই না...
লিস্ট চেক করে দেখি অ্যানাটমি, ফিজিওলজীর কয়েকটা বইয়ের নাম লেখা....
--ইয়ে, এগুলো কার জন্য?...
--স্যার, আমার ছেলের জন্য....
--আপনার ছেলে কি মেডিকেলে পড়ে নাকি?....
--জ্বে স্যার, প্রাইভেট মেডিকেলে পড়ে।মনে একটা শখ ছিলো স্যার, জমানো ট্যাকা ছিলো কিছু, জমিও বেইচা দিছি....
--(আমি আঁতকে ওঠে)বলেন কি!!
--(আনন্দিত কণ্ঠে) জ্বে স্যার, পাঁচ বছর না হয় এট্টু কষ্ট করলাম।ছেলে ডাক্তার হইলে আর চিন্তা কি, চাকরীডা তহন ছাইরা দিমু....
আমি দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়লাম।আমি জানি, পাঁচ বছর পর উনার এই আনন্দিতকণ্ঠ আর শুনতে পাওয়া যাবে না....
২......
আজ থেকে বছর ত্রিশেক আগের কথা বলি, শোনা কথা।ডাক্তারদের চাকরির বাজার তখন বেশ রমরমা।MBBS কমপ্লিট করা মাত্রই চাকরী নিশ্চিত।সরকার আবার বন্ড সইও রাখে যাতে এরা আবার চাকরী ছেড়ে দেশের বাইরে চলে না যায়....
নিজের শ্বশুরমশাইয়ের কথাই বলি।সৌদি আরব থেকে লোক এলো তাদের দেশে মেডিসিনের ডাক্তার রিক্রুট করার জন্য।শ্বশুরমশাই সার্জারীর ডক্টর, RS(রেসিডেন্ট সার্জন) হিসেবে কাজ করছিলেন।সহজে ডাক্তার পাওয়া যায় না, তারা উনাকেই ধরে নিয়ে গেলেন.....
অবস্থা কিন্তু এখন আর সেইরকম নেই।শত শত ছেলেমেয়ে এখন সরকারী মেডিকেলে ভর্তি হয়।লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে ছেলেমেয়েরা এখন প্রাইভেট মেডিকেলেও ঢোকে, কেনো ঢোকে তা আমার আজও অজানা।প্রাইভেট মেডিকেলে পড়ে এমন এক জুনিয়র একবার আমাকে বলেছিলো, "ভাই, প্রতিমাসে আব্বার কাছ থেকে বেতনটা নেবার সময় তার চোখের দিকে তাকাতে পারিনা, মনে হয় আব্বারে চুইষা খাইতেছি...."
সরকারী বা বেসরকারী যেখানেই ভর্তি হোক না কেনো, যে মোহ নিয়ে তারা এসব জায়গায় ঢোকে, সে মোহমুক্তি ঘটতে তাদের কিন্তু খুব একটা সময় লাগে না.....
৩...
শত শত ডাক্তার বেকার, হাজার হাজার ছেলেমেয়ে পাইপলাইনে বসে ডাক্তার হবার দিন গুণছে, সে তুলনায় জব নেই বললেই চলে, দেশের বাইরের জব মার্কেটও সংকুচিত....
ফলাফল কি?
ফলাফল হলো- চিকিৎসাশাস্ত্রের মত একটি নোবেল প্রোফেশনে এদেশের ছেলেমেয়েরা অনেকটা বেকারের মত দিন যাপন করছে, নগণ্য কিছু ছেলেমেয়ে সরকারী চাকরী পাচ্ছে, অধিকাংশ ছেলেমেয়েকে তাদের সার্টিফিকেট ক্লিনিক ব্যবসায়ীদের কাছে জিম্মায় রেখে মাসে মাত্র ২০০০০-২৫০০০ টাকায় জব স্টার্ট করতে বাধ্য হচ্ছে...
পোস্ট গ্রাজুয়েশন করতে চাইলে অবস্থাটা হয় আরো ভয়ানক।MBBS এর পর আবারও মোটামুটি ৩-৪ বছর বিনাপয়সায় খেটে যেতে হবে "অনারারি" নামক এক দাসপ্রথার কারণে।এরপরও পোস্ট গ্রাজুয়েশন নিশ্চিত নয়, পাশ রেট-৫-৭%.....
অন্যান্য সেক্টরের ছেলেমেয়েরা যখন ৪ বছর গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করে চাকরীতে ঢুকে মাসে হাজার চল্লিশেক টাকা ইনকাম শুরু করে, বা বিসিএসে ঢুকে Aristocratic ভাবসাব নিয়ে চলাফেরা শুরু করে, মেডিকেল সেক্টরে তখন MBBS+ ইন্টার্ণী কমপ্লিট করতে করতেই ৬ বছর পার হয়ে যায়।যদি পোস্ট গ্রাজুয়েশন করার খায়েশ থাকে তবে আরো ৪-৫ বছরের অনেকটা বিনা পয়সায় খাটুনি খাটতে হয়।আচ্ছা, মানুষের জীবনটা কয় বছরের?
পোস্ট গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করলেই কি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে?
ব্যাপারটা সেরকমও না।নিজের চোখে পোস্ট গ্রাজুয়েশন করা এক ডক্টরকে এক ফার্মেসীর মালিকের কাছে অনুনয় বিনয় করতে দেখেছি যাতে করে তার ফার্মেসীতে একটু বসা যায়।পোস্ট গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করেও আমি স্টুডেন্ট পড়াতে দেখেছি....
৪....
এত কষ্ট করার পর মানবসেবায় তৃপ্তি পেলে হতো।ঘটনা তেমনটা ঘটে না.....
আপনি ১০০ জন লোককে সুস্থ করার চেষ্টা চালিয়েছেন, তার জন্য আপনাকে কেউ ক্রেডিট দিবে না। ১ জন লোক আপনার হাতে খারাপ হয়েছে, ব্যস, আর যাবেন কোথায়?
মনে রাখবেন, সে সময় কেউ আপনার শত লোককে ভালো করার চেষ্টার কথা মাথায় রাখবে না, কিল-ঘুষি কোনোটা আর মাটিতে পরবে না, পরলে আবার সেটা উঠিয়ে আপনার পিঠে বসিয়ে দিবে.....
মার তো খেলেনই, পরদিন পেপারে আপনার ছবি সাঁটিয়ে সাংবাদিকরা আবার লিখবেন, "ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু"....
৫.....
Let me clear one thing....
প্রতিবছর হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়।
কেনো নেয়?....
তার প্রথম কারণ, উপরে যে বঞ্চণার কথাগুলো বললাম সেটা সাধারণ মানুষ জানে না।প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির মাঝে এই সেক্টরে বর্তমানে যে যোজন যোজন ফারাক সেটা জানানোর দায়িত্বটা আমাদেরই ছিলো, আমরা জানাইনি, মুখে কুলুপ এটে বসে ছিলাম.....
দ্বিতীয়ত, সাধারণ মানুষের মনে গড়ে ওঠা একটা 'মিথ' যে- মেডিকেলীয় লাইফটা অর্থ-বিত্ত আর প্রাচুর্যে ভরপুর, মেডিকেলীয় লাইফটা সিকিওরড্....
তাদেরকে কিভাবে বোঝাই যে, একজন সাধারণ চিকিৎসক হিসেবে এদেশে বেঁচে থাকতে চাইলে যে কষ্টটুকু করতে হয় তার এক-দশমাংশ পরিশ্রমে অন্য যেকোনো সেক্টরে রাজার হালে থাকা যায়....
৬.....
এবার একটু সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করি।আমরা তৈল-মর্দন প্রিয় জাতি, আমরা তেলবাজী করে আনন্দ পাই, গঠনমূলক সমালোচনা করতে ভয় পাই। এরকম হবার কথা ছিলো না, দেশটা আমার, আমাদের....
দিনের পর দিন এদেশ থেকে Skilled Manpowerকে দেশের বাইরে পাঠানোর রাস্তাকে সংকুচিত করা হয়েছে।নীতিনির্ধারকরা এদেশ থেকে বিদেশে শ্রমিক পাঠাতে পারলে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলেন।তাদের এ বুঝটা কেনো আসেনা যে--১০ জন শ্রমিক পাঠানোর চাইতে ১ জন চিকিৎসককে বিদেশে পাঠানো সবদিক থেকেই উত্তম...
আমরা যখন এদেশ থেকে বাইরে চিকিৎসক পাঠাতে কূটনৈতিক ব্যর্থতায় পর্যবসিত, তখন ইন্ডিয়া তাদের চিকিৎসকদের দেশের বাইরে মেলে ধরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াচ্ছে...
সঠিক কূটনৈতিক তৎপরতায় যদি এদেশ থেকে দেশের বাইরে শত শত চিকিৎসক পাঠানো নিশ্চিত করা যেতো, তবে আজ এদেশে চিকিৎসকদের এত নাকানিচুবানি খেতে হয় না.....
৭.....
জাতি হিসেবে আমরা Illusionists, Delusional ও বটে, আমরা মরীচিকাকে প্রাধান্য দেই। পাঁচ শতাংশ ডাক্তারের শান-শওকতে আমরা প্রলুব্ধ হই, পঁচানব্বই শতাংশ ডাক্তাররা অন্যান্য সেক্টরের লোকদের তুলনায় কতটা মানবেতর জীবনযাপন করে তার খবর জানি না.....
আমরা Tip of the Iceberg এর রূপ দেখে মুগ্ধ হই, Iceberg এর যে বৃহৎ অংশ পানিতে ডুবে থাকে তার খবর রাখি না।আমরা মিথকে আলিঙ্গন করে কণ্টকাকীর্ণ জীবনকে বেছে নেই, Reality কে ছুড়ে ফেলি।"চিকিৎসক হতেই হবে"-- আমাদের এই Delusion-টা কবে ভাঙবে?
[পুনশ্চঃ এত কিছু জানার পরও মানবসেবার নিমিত্তে কেউ যদি "জেনে শুনে বিষ পান" করে "নীলকণ্ঠ চিকিৎসক" হতে আগ্রহী হয়, তবে আমি তাকে স্বাগত জানাই.....
"উদয়ের পথে শুনি কার বাণী,
ভয় নাই, ওরে ভয় নাই--
নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান
ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।".....]


লিখেছেনঃ জামান অ্যালেক্স

Kindly Bookmark this Post using your favorite Bookmarking service:
Technorati Digg This Stumble Stumble Facebook Twitter

0 comments:

Post a Comment

 

| Medical Science © 2013. All Rights Reserved | Design by Md.Mahbubul Islam |