Sunday, April 30, 2017

অনারারী ও রেসিডেন্সী এবং দাসপ্রথার সাতকাহন

0 comments
২০১৩।আমি তখন অনারারী মেডিকেল অফিসার(HMO) হিসেবে DMCH এর মেডিসিন ডিপার্টমেন্টে।দুষ্ট লোকেরা "#অনারারী মেডিকেল অফিসার" এর স্থলে আমাদের ডাকে "#অনাহারী মেডিকেল অফিসার"। নামটা যুতসই, যে ব্যক্তির মাথায় প্রথমে অনাহারী শব্দটা এসেছিলো, তার তাচ্ছিল্য ও রসবোধের প্রশংসা করতে হয়....
কাজের কথায় আসি।কথায় বলে, "পিপীলিকার পাখা গজায় মরিবার তরে"। আমার পাখা গজালো।এমনিতেই অনাহারী মেডিকেল অফিসার, তার উপর নিজের ইচ্ছায় মেডিসিনের যে ইউনিটে ঢুকেছি-সে ইউনিট থেকে অধিকাংশ ট্রেইনি ডাক্তার দূরে দূরে থাকে।"ডে- অফ" বলে কোন বিষয়ের বালাই সে ইউনিটে নেই....
যেহেতু রোস্টার ডিউটি বেশী পড়ে, একবার সব HMO মিলে চেষ্টা করলাম, কোনভাবে সপ্তাহে একটা ডে অফ ম্যানেজ করা যায় কিনা, শরীরে কুলায় না । সিএ ভাই, ইউনিট হেড- কিংবদন্তীতুল্য শ্রদ্ধেয় স্যারের সাথে দেখা করে এসে জানালেন, "স্যার বলেছেন, তোমাদের রোস্টার ডিউটি বেশী পড়লে, এখন থেকে রোস্টারে উনার নামটাও রাখতে"....
#কড়া_মেসেজ, এরপরে আর ডে অফ নিয়ে কথা বাড়ানো চলে না।আমি অবশ্য ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি ট্রেনিং এমনই হওয়া উচিত।যাই হোক, মোটামুটি অঘোষিত '#মার্শাল_ল' সিস্টেমের ভিতর দিয়ে রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছি, একেবারে বিনে পয়সায়....
একদিন নাইট ডিউটি, একটু দেরী হওয়াতে হাতে Stethoscope নিয়ে দ্রুত বাসা থেকে বের হয়ে রিকশা নিয়ে DMCH এর ইমার্জেন্সী গেইটে নেমে রিকশাওয়ালাকে ৬০ টাকা দিয়ে হাঁটা শুরু করা মাত্র রিকশাওয়ালা পেছন থেকে ডাক দিলোঃ
--এই যে, কত দিলেন?
--কেন, ৬০ টাকা!
--৭০ টাকা দেন দেহি...
--৭০ টাকা কেন? ডেইলি ৬০ টাকা দিয়ে আসি.....
এই কথা বলে আমি আবার হাঁটা দিলাম।পেছনে শুনলাম আমার রিকশাওয়ালা তার পাশের রিকশাওয়ালাকে বলছে, "খাডাশের দল, লাখ লাখ ট্যাহা কামায়, আর আমাগো ১০ ট্যাহা দিবার চায় না"...
থমকে দাঁড়ালাম, একবার ভাবলাম বলি, "তুমি রিকশা চালাও, পরিশ্রমের সেই টাকাটা পাও, আমি সকাল, দুপুর এমনকি রাত্রে জেগে থেকেও ডিউটি করি, একটা পয়সাও জোটে না"। কথাটা বলা হয়নি....
আবারও অনারারী ট্রেনিং পিরিয়ডের কথা। ডিউটি সেরে প্রতিদিন রিকশা করে বাসায় ফিরি।রিকশার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো-নিজেকে রাস্তার পরিবেশ থেকে আলাদা মনে হয় না, চারপাশের দৃশ্য ভালোমত দেখতে দেখতে যাওয়া যায়, গাড়ীতে সে সুযোগ নেই, গাড়ীতে অদৃশ্য পর্দা থাকে, পরিবেশের সাথে মেশা যায় না....
যে ইউনিটে ট্রেনিং করি, সেই ইউনিটের অসম্ভব Punctual একজন HMO বড় ভাইকে আমি মনে মনে যথেষ্ঠ শ্রদ্ধা করতাম, এখনোও করি।আমি পরপর কয়েকদিন বাসায় ফেরার সময় রিকশা থেকে লক্ষ্য করলাম ডিউটি শেষে ওই সিনিয়র ভাই রাস্তা দিয়ে হে্ঁটে হেঁটে বাসায় ফেরেন। প্রায় দুই কিলোমিটার রাস্তা, হসপিটাল ডিউটি কমপ্লিট করে দুপুরের রোদে দুই কিলোমিটার হেঁটে যাওয়াটা মুখের কথা না, মনের আনন্দে কেউ এই কাজ প্রতিদিন করবে না....
আমি একদিন ক্যান্টিনে চা খেতে খেতে ভাইকে কথায় কথায় বললাম যে উনি ইচ্ছা করলে আমার সাথে যেতে পারেন। ভাই একটু উদাস হয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইলেন।কয়েকদিন গিয়েও ছিলেন আমার সাথে।তারপর বাদ দিলেন, বোধ হয় -লজ্জায়....
শুনেছিলাম তাঁর কিছু করুণ কাহিনী। উনি আমার থেকে বছর পাঁচেকের বড়।নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। বাবা-মা অনেক আশা করে প্রচুর ঋণ নিয়ে প্রাইভেট মেডিকেলে পড়িয়েছিলেন, ছেলে ডাক্তার হলে এসব ঋণ কোন বিষয় হবার কথা না....
সেই ঋণের বোঝা টানতে গিয়ে তিনি ৪ বছর ক্লিনিকগুলোতে ডিউটি করেছেন।এক মেয়েকে পছন্দ করতেন, মেয়েও করতো, সেই সম্পর্ক নিজেই ধ্বংস করেছেন।নিজের এহেন দৈন্যহীন অবস্থায় প্রেম-ভালোবাসার মত বিলাসী জিনিস তার শোভা পায় না। অন্যদিকে পোষ্ট গ্রাজুয়েট ট্রেনিং এর সময় তো থেমে থাকেনা।বাবা-মা যখন আশা করছেন ছেলে ডাক্তারী পাশ করে প্রাচুর্য নিয়ে আসবে, তখন তিনি ট্রেনিং এ ঢুকলেন।তাঁর পিতা, পুত্রের ভবিষ্যতের দিকে চেয়ে আবারও এখন কষ্ট করে প্রতি মাসে টাকা পাঠাতে শুরু করলেন।নিম্নমধ্যবিত্ত থেকে মধ্য-মধ্যবিত্তরা তাদের ছেলেমেয়েকে ডাক্তার বানাতে চাইলে এদেশের প্রেক্ষাপটে তাদের খেসারত দিতে হবে বৈ কি!...
একদিন পেশেন্ট ফলো আপ দিচ্ছি। হঠাৎ ভাই কোথা থেকে যেন এসে আমার পাশে দাড়ালেন।ভাইয়ের চেহারায় আলো ঝলমল করছে।অত্যন্ত আনন্দ নিয়ে ভাই আমাকে বললেন,
"জানো কনক, আমি রেসিডেন্সীতে চান্স পেয়েছি, প্রতি মাসে ১০,০০০(দশ হাজার) টাকা করে পাব"....
ভাইয়ের সে আনন্দ দেখে বুঝেছিলাম, ১০,০০০ টাকাটা নিছক একটা সংখ্যা ছিলো না, সেটি ছিলো দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত এক মানুষের জীবনে হঠাৎ কালবোশেখীর এক শীতল হাওয়া...
এই যে, অনারারী প্রথা এখনও চলছে, আমি জানি না, এই অযৌক্তিক বর্বর প্রথা কবে, কে শুরু করেছিলেন।আপনি কি কখনোও চিন্তা করতে পারেন, আপনি একটা অশিক্ষিত লোককে ৭ দিন খাটাবেন, অথচ একটা পয়সাও দিবেন না; কোন সভ্য সমাজ এর স্বীকৃতি দিবে? প্রশ্নই আসে না। তবে কোন যুক্তিতে একজন উচ্চ শিক্ষিত চিকিৎসককে ৩ থেকে ৫ বছর, আই রিপিট, ৩ থেকে ৫ বছর, বিনা পয়সায় খাটাবেন? পোষ্ট গ্রাজুয়েশনের কোন নিশ্চয়তা তো নেই। অনেকে বলতে পারেন, কিছু তো শিখছে। আমি তাদের বলি, মেডিকেল সায়েন্সে আজ যিনি অধ্যাপক, উনিও প্রতিনিয়ত শিখছেন। মোস্ট প্রবাবলি, #William_Osler বলেছিলেন, 'যেদিন কোন চিকিৎসক মনে করবেন তিনি আর নতুন কিছু শিখবেন না, বুঝতে হবে, চিকিৎসক হিসেবে ওইদিন তার মৃত্যু হয়েছে'।কাজেই শিখানো হচ্ছে এই ধোয়া তুলে এই বর্বর প্রথা সমর্থন যোগ্য নয়। যেখানে বর্বর প্রথার সমাপ্তি হবার কথা, সেখানে এই দেশে এই প্রথার আপসার্জ হচ্ছে.....
অনারারী ট্রেইনি যারা, তারা না ট্রেনিং এ মনোযোগ দিতে পারে, না ক্লিনিকে মনোযোগ দিতে পারে।যেহেতু একটি পয়সাও আয় নেই, অথচ তার সমতুল্য বন্ধুরা তখন কম করে হলেও হাজার পঞ্চাশেক টাকা কামিয়ে চলছে, এমন অবস্থায় ক্লিনিক এ ঢু মারতে গিয়ে ট্রেনিং এর বারোটা বাজে। ক্লিনিকগুলোতে ঢু না মারলেও তো চলে না, এই বয়সে বাসা থেকে টাকা চাওয়া যায়? বিয়ে করে ফেললে তো গোদের উপর বিষফোঁড়া....
রেসিডেন্সীটা সে হিসেবে ভালো। হাজার দশেক টাকা পাওয়া যায় যে! হাজার দশেক টাকায়( কেটেকুটে সাড়ে আট এর মত) ডাল-ভাত আর শাহবাগের আজিজ এ এক খাট ফেলে ঘুমটা তো নিশ্চিন্তে করা যায়! হাজার দশেক টাকা! চিন্তা করতে পারেন কত অগুণিত পয়সা! সুশীল সমাজকে একটা প্রশ্নঃ 'এই টাকায় পাহারা দেবার জন্য একজন দারোয়ান পাওয়া যাবে তো?'....
এবার কোর পয়েন্টে আসি।অনারারী ট্রেইনী ও রেসিডেন্সীদের ভাতা দিতে হবে। সব সভ্য দেশই দেয়, বাংলাদেশ ব্যতিক্রম । প্রশ্ন হলো, টাকাটা আসবে কোথা থেকে? রেসিডেন্সী হিসেবে যারা আছেন, সেই সাড়ে চার'শ মত চিকিৎসক কে তাদের ভাতা দিতে খরচ হবে বছরে মাত্র ৫.৮ কোটি টাকা।এই টাকাটা BSMMU কেই কেন দিতে হবে? যদি অনারারী সহই ধরি, তবে প্রতি বছর খরচ হবে ২০-৩০ কোটি টাকা( ধরে নিলাম)। এই টাকাটা দেয়া উচিত #সরকারের। আমাদের দেশতো বর্হিবিশ্বে স্বাস্থ্যখাতে রোল মডেল।যদি তাই হয়, তবে চিকিৎসক নেতৃবৃন্দরা অনারারী ও প্রায় বিনা বেতনে যে রেসিডেন্সী প্রোগ্রাম চলে তার যবনিকাপাতে ব্যবস্থা নিতে পারেন না? ...
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী আমরা এখন মধ্যম আয়ের কান্ট্রি। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৪৪ তম বাজেটের আকার প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা। প্রতিবছর ২০-৩০ কোটি টাকা সেখানে নিতান্তই ক্ষুদ্র একটি সংখ্যা। এই টাকার অনুমোদন কি সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া যায় না? অপ্রয়োজনীয় বিলাস বহুল গাড়ী কিনতে হর্তাকর্তারা কোটি কোটি টাকা শুল্কমুক্ত সুবিধা পান। যে সমস্ত নবীন চিকিৎসকদের ব্যবহার করে তাদের রক্ত পানি করে জনগণকে বিনাপয়সায় স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হচ্ছে, তাদের দিকে কি সরকার এই সহানুভূতির হাতটি প্রসারিত করতে পারে না? একটি দেশ কি তার নিজের সন্তানের সাথে এমন প্রতারণা করতে পারে? এরা কি বাইরের কেউ?....
১৮৬৩ সালে Abraham Lincoln মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দাস প্রথার অবসান ঘটান এবং #মুক্তি_ঘোষণা (Emancipation Proclamation) এর মাধ্যমে দাসদের মুক্ত করে দেন। প্রায় ১৫০ বছর পর সভ্য সমাজের মানুষ হয়েও আমরা সমাজের বিভিন্ন জায়গায় নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য এই প্রথাকে বিভিন্ন রঙের মুখোশ পরিয়ে টিকিয়ে রেখেছি....
"If slavery is right, it ought to be extended ; if not, it ought to be restricted, there is no middle ground." আমরা দাসপ্রথাকে Restricted করতে পারিনি, আমরা Extended করেছি।আমরা সভ্য হতে পারিনি, আমরা জাতিগতভাবে অসভ্য হয়েছি।আমরা প্রকৃত পক্ষে আধুনিক হতে পারিনি, আমরা মধ্যযুগীয় মানসিকতাকে চর্চা করে চলছি। হাজারখানেক চিকিৎসক পোষ্টগ্রাজুয়েশনের মায়াবী হাতছানির শিকলে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর বিনে পয়সায় দাসত্ব চালিয়ে যাবে। এদের দীর্ঘশ্বাসের করুণ কাহিনী অরণ্যে রোদনের মত আকাশে বাতাসে মিলিয়ে যাবে, কেউ কর্ণপাত করবে না, কেউ সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসবে না। আহারে!....আহারে!.....


লিখেছেনঃ জামান অ্যালেক্স

Tuesday, April 4, 2017

#The_Illusion_and_Delusion...

0 comments
১.....
হাত ভেঙে ঘরে বসে থাকা কোনো কাজের কথা না।আপাতত সেটাই করতে হচ্ছে।সকাল সকাল উঠে একটু পড়তে চাইলাম, কনসেনট্রেট করতে পারলাম না।মনকে ডাইভার্ট করতে ইউটিউবে "The Amazon Tribe" লিখে সার্চ দিলাম....
অদ্ভুত অদ্ভুত সব ভিডিও দেখছি।আমাজন জঙ্গলের গভীরে এক উপজাতি বাস করে যাদের সাথে বহির্বিশ্বের কোনো যোগাযোগ নেই, প্লেন থেকে ভিডিও করে তাদের দেখানো হচ্ছে।উপজাতিগুলো প্লেনের দিকে বর্শা/তীর ছুঁড়ছে।যারা ভিডিও করছেন তারা ডিসিশন নিয়েছেন যে এই উপজাতিটির সাথে তারা কোনো Contact করবেন না, যেহেতু উপজাতিটির সাথে হাজার হাজার বছর ধরে আমাদের যোগাযোগ নেই কাজেই আমাদের সংস্পর্শে কমন ফ্লু রোগেই এরা সবাই মারা যেতে পারে, কমন ফ্লু প্রতিরোধ করার মত ক্ষমতা এদের নেই বলেই ধারণা করা হচ্ছে .....
হাবিজাবি এইসব ভিডিও দেখে সকাল ৭ টায় ফ্ল্যাটের নীচে নেমেছি পেইনকিলার কেনার জন্য।এমন সময় এক মধ্যবয়সী লোক আমার সামনে এসে দাঁড়ালো....
--স্লামালিকুম স্যার...
--ওয়াআলাইকুমুসসালাম...
--স্যার, আমি এই ফ্ল্যাটেরই রশীদ স্যারের গাড়ি চালাই....
--ওহ আচ্ছা, কি ব্যাপার?....
--এই লিস্টটা একটু দেইখা আমারে বলেন তো স্যার-কোন্ কোন্ বই না কিনলেই না...
লিস্ট চেক করে দেখি অ্যানাটমি, ফিজিওলজীর কয়েকটা বইয়ের নাম লেখা....
--ইয়ে, এগুলো কার জন্য?...
--স্যার, আমার ছেলের জন্য....
--আপনার ছেলে কি মেডিকেলে পড়ে নাকি?....
--জ্বে স্যার, প্রাইভেট মেডিকেলে পড়ে।মনে একটা শখ ছিলো স্যার, জমানো ট্যাকা ছিলো কিছু, জমিও বেইচা দিছি....
--(আমি আঁতকে ওঠে)বলেন কি!!
--(আনন্দিত কণ্ঠে) জ্বে স্যার, পাঁচ বছর না হয় এট্টু কষ্ট করলাম।ছেলে ডাক্তার হইলে আর চিন্তা কি, চাকরীডা তহন ছাইরা দিমু....
আমি দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়লাম।আমি জানি, পাঁচ বছর পর উনার এই আনন্দিতকণ্ঠ আর শুনতে পাওয়া যাবে না....
২......
আজ থেকে বছর ত্রিশেক আগের কথা বলি, শোনা কথা।ডাক্তারদের চাকরির বাজার তখন বেশ রমরমা।MBBS কমপ্লিট করা মাত্রই চাকরী নিশ্চিত।সরকার আবার বন্ড সইও রাখে যাতে এরা আবার চাকরী ছেড়ে দেশের বাইরে চলে না যায়....
নিজের শ্বশুরমশাইয়ের কথাই বলি।সৌদি আরব থেকে লোক এলো তাদের দেশে মেডিসিনের ডাক্তার রিক্রুট করার জন্য।শ্বশুরমশাই সার্জারীর ডক্টর, RS(রেসিডেন্ট সার্জন) হিসেবে কাজ করছিলেন।সহজে ডাক্তার পাওয়া যায় না, তারা উনাকেই ধরে নিয়ে গেলেন.....
অবস্থা কিন্তু এখন আর সেইরকম নেই।শত শত ছেলেমেয়ে এখন সরকারী মেডিকেলে ভর্তি হয়।লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে ছেলেমেয়েরা এখন প্রাইভেট মেডিকেলেও ঢোকে, কেনো ঢোকে তা আমার আজও অজানা।প্রাইভেট মেডিকেলে পড়ে এমন এক জুনিয়র একবার আমাকে বলেছিলো, "ভাই, প্রতিমাসে আব্বার কাছ থেকে বেতনটা নেবার সময় তার চোখের দিকে তাকাতে পারিনা, মনে হয় আব্বারে চুইষা খাইতেছি...."
সরকারী বা বেসরকারী যেখানেই ভর্তি হোক না কেনো, যে মোহ নিয়ে তারা এসব জায়গায় ঢোকে, সে মোহমুক্তি ঘটতে তাদের কিন্তু খুব একটা সময় লাগে না.....
৩...
শত শত ডাক্তার বেকার, হাজার হাজার ছেলেমেয়ে পাইপলাইনে বসে ডাক্তার হবার দিন গুণছে, সে তুলনায় জব নেই বললেই চলে, দেশের বাইরের জব মার্কেটও সংকুচিত....
ফলাফল কি?
ফলাফল হলো- চিকিৎসাশাস্ত্রের মত একটি নোবেল প্রোফেশনে এদেশের ছেলেমেয়েরা অনেকটা বেকারের মত দিন যাপন করছে, নগণ্য কিছু ছেলেমেয়ে সরকারী চাকরী পাচ্ছে, অধিকাংশ ছেলেমেয়েকে তাদের সার্টিফিকেট ক্লিনিক ব্যবসায়ীদের কাছে জিম্মায় রেখে মাসে মাত্র ২০০০০-২৫০০০ টাকায় জব স্টার্ট করতে বাধ্য হচ্ছে...
পোস্ট গ্রাজুয়েশন করতে চাইলে অবস্থাটা হয় আরো ভয়ানক।MBBS এর পর আবারও মোটামুটি ৩-৪ বছর বিনাপয়সায় খেটে যেতে হবে "অনারারি" নামক এক দাসপ্রথার কারণে।এরপরও পোস্ট গ্রাজুয়েশন নিশ্চিত নয়, পাশ রেট-৫-৭%.....
অন্যান্য সেক্টরের ছেলেমেয়েরা যখন ৪ বছর গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করে চাকরীতে ঢুকে মাসে হাজার চল্লিশেক টাকা ইনকাম শুরু করে, বা বিসিএসে ঢুকে Aristocratic ভাবসাব নিয়ে চলাফেরা শুরু করে, মেডিকেল সেক্টরে তখন MBBS+ ইন্টার্ণী কমপ্লিট করতে করতেই ৬ বছর পার হয়ে যায়।যদি পোস্ট গ্রাজুয়েশন করার খায়েশ থাকে তবে আরো ৪-৫ বছরের অনেকটা বিনা পয়সায় খাটুনি খাটতে হয়।আচ্ছা, মানুষের জীবনটা কয় বছরের?
পোস্ট গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করলেই কি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে?
ব্যাপারটা সেরকমও না।নিজের চোখে পোস্ট গ্রাজুয়েশন করা এক ডক্টরকে এক ফার্মেসীর মালিকের কাছে অনুনয় বিনয় করতে দেখেছি যাতে করে তার ফার্মেসীতে একটু বসা যায়।পোস্ট গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করেও আমি স্টুডেন্ট পড়াতে দেখেছি....
৪....
এত কষ্ট করার পর মানবসেবায় তৃপ্তি পেলে হতো।ঘটনা তেমনটা ঘটে না.....
আপনি ১০০ জন লোককে সুস্থ করার চেষ্টা চালিয়েছেন, তার জন্য আপনাকে কেউ ক্রেডিট দিবে না। ১ জন লোক আপনার হাতে খারাপ হয়েছে, ব্যস, আর যাবেন কোথায়?
মনে রাখবেন, সে সময় কেউ আপনার শত লোককে ভালো করার চেষ্টার কথা মাথায় রাখবে না, কিল-ঘুষি কোনোটা আর মাটিতে পরবে না, পরলে আবার সেটা উঠিয়ে আপনার পিঠে বসিয়ে দিবে.....
মার তো খেলেনই, পরদিন পেপারে আপনার ছবি সাঁটিয়ে সাংবাদিকরা আবার লিখবেন, "ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু"....
৫.....
Let me clear one thing....
প্রতিবছর হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়।
কেনো নেয়?....
তার প্রথম কারণ, উপরে যে বঞ্চণার কথাগুলো বললাম সেটা সাধারণ মানুষ জানে না।প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির মাঝে এই সেক্টরে বর্তমানে যে যোজন যোজন ফারাক সেটা জানানোর দায়িত্বটা আমাদেরই ছিলো, আমরা জানাইনি, মুখে কুলুপ এটে বসে ছিলাম.....
দ্বিতীয়ত, সাধারণ মানুষের মনে গড়ে ওঠা একটা 'মিথ' যে- মেডিকেলীয় লাইফটা অর্থ-বিত্ত আর প্রাচুর্যে ভরপুর, মেডিকেলীয় লাইফটা সিকিওরড্....
তাদেরকে কিভাবে বোঝাই যে, একজন সাধারণ চিকিৎসক হিসেবে এদেশে বেঁচে থাকতে চাইলে যে কষ্টটুকু করতে হয় তার এক-দশমাংশ পরিশ্রমে অন্য যেকোনো সেক্টরে রাজার হালে থাকা যায়....
৬.....
এবার একটু সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করি।আমরা তৈল-মর্দন প্রিয় জাতি, আমরা তেলবাজী করে আনন্দ পাই, গঠনমূলক সমালোচনা করতে ভয় পাই। এরকম হবার কথা ছিলো না, দেশটা আমার, আমাদের....
দিনের পর দিন এদেশ থেকে Skilled Manpowerকে দেশের বাইরে পাঠানোর রাস্তাকে সংকুচিত করা হয়েছে।নীতিনির্ধারকরা এদেশ থেকে বিদেশে শ্রমিক পাঠাতে পারলে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলেন।তাদের এ বুঝটা কেনো আসেনা যে--১০ জন শ্রমিক পাঠানোর চাইতে ১ জন চিকিৎসককে বিদেশে পাঠানো সবদিক থেকেই উত্তম...
আমরা যখন এদেশ থেকে বাইরে চিকিৎসক পাঠাতে কূটনৈতিক ব্যর্থতায় পর্যবসিত, তখন ইন্ডিয়া তাদের চিকিৎসকদের দেশের বাইরে মেলে ধরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াচ্ছে...
সঠিক কূটনৈতিক তৎপরতায় যদি এদেশ থেকে দেশের বাইরে শত শত চিকিৎসক পাঠানো নিশ্চিত করা যেতো, তবে আজ এদেশে চিকিৎসকদের এত নাকানিচুবানি খেতে হয় না.....
৭.....
জাতি হিসেবে আমরা Illusionists, Delusional ও বটে, আমরা মরীচিকাকে প্রাধান্য দেই। পাঁচ শতাংশ ডাক্তারের শান-শওকতে আমরা প্রলুব্ধ হই, পঁচানব্বই শতাংশ ডাক্তাররা অন্যান্য সেক্টরের লোকদের তুলনায় কতটা মানবেতর জীবনযাপন করে তার খবর জানি না.....
আমরা Tip of the Iceberg এর রূপ দেখে মুগ্ধ হই, Iceberg এর যে বৃহৎ অংশ পানিতে ডুবে থাকে তার খবর রাখি না।আমরা মিথকে আলিঙ্গন করে কণ্টকাকীর্ণ জীবনকে বেছে নেই, Reality কে ছুড়ে ফেলি।"চিকিৎসক হতেই হবে"-- আমাদের এই Delusion-টা কবে ভাঙবে?
[পুনশ্চঃ এত কিছু জানার পরও মানবসেবার নিমিত্তে কেউ যদি "জেনে শুনে বিষ পান" করে "নীলকণ্ঠ চিকিৎসক" হতে আগ্রহী হয়, তবে আমি তাকে স্বাগত জানাই.....
"উদয়ের পথে শুনি কার বাণী,
ভয় নাই, ওরে ভয় নাই--
নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান
ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।".....]


লিখেছেনঃ জামান অ্যালেক্স

Wednesday, March 22, 2017

বাস্তবে চিকিৎসকদের সুখ কোথায় ?

0 comments
                
আমাদের দেশে খুব ছোটবেলা থেকে মাথায় ঢুকিয়ে দেয়া হয়, বড় হয়ে ডাক্তার হতে হবে, কারণ হিসেবে বলা হয় ডাক্তারদের অনেক টাকা, ডাক্তাররা কখনো গরীব হয় না, অভাব ডাক্তারদের দরজায় কড়া নাড়ে না। আর এটা কে মানুষ অন্ধভাবে বিশ্বাস করে বড় হয়।
কিন্তু, বাস্তবে কি আসলেই, চিকিৎসকরা খুব সুখে আছে? আচ্ছা একটু সরকারী ক্যাডারদের দিকে তাকাই। চিকিৎসকরা যখন এমবিবিএস পাশ করে সরকারী ক্যাডারে ঢুকছে, তখন অন্য অারেকজন হয়ত, অনার্স পাশ করে ঢুকছে। এখন এখানে দেখা যাচ্ছে, সেই অনার্স পাশকৃত ব্যক্তিটি হয়ত মাস্টারস পাশ না করেও পদন্নোতি পাবে, কিন্তু এমবিবিএস পাশকৃত ব্যক্তিটিকে অধ্যাপক, কিংবা রেজিসট্রার হিসেবে পদন্নোতি পেতে কিন্তু অবশ্যই পোস্ট গ্রাজুয়েশন এর চৌকাঠ পার হতে হবে।
এক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, একই সাথে ক্যাডারে জয়েন করা সেই জেনারেল লাইন এর ব্যক্তিটি হয়ত পদন্নোতি পেয়ে প্রটৌকল পেয়ে ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে গিয়েছে, আর সেই হতভাগ্য চিকিৎসক টি হয়ত উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স এ ভাঙা চেয়ারে বসে মানবসেবা করে যাচ্ছে এবং মহান ব্যক্তিদের প্রহার এর স্বীকার হচ্ছে। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, এক দেশে কেন দুই নিয়ম হবে? সেই বাংলায় অনার্স করা ব্যক্তি টি পদন্নোতি পেয়ে, ম্যাজিসট্রেট হয়ে প্রটৌকল নিয়ে চলছে, বিশাল বাংলো পাচ্ছে, তাহলে সেই চিকিৎসক কি দোষ করলো? সে কি সেই বাংলায় অনার্স করা ব্যক্তি টি র চাইতে কম মেধাবী?
আরেক টা ব্যাপার, আমার খুব অবাক লাগে, বিশ্ববিদ্যালয় এর শিক্ষকরা সবাই ভালো কোয়ার্টার পায়, কিন্তু চিকিৎসকদের জন্য কি এরকম কোন কোয়ার্টার এর ব্যবস্থা করা হয়? যারা দিনের পর দিন কষ্ট করে, তারা কি সরকার এর পক্ষ থেকে ভালো কিছুর আশা করতে পারে না?
আমাকে কেউ কি বলতে পারবেন, এদেশে কি কোন কিছু ফ্রি পাওয়া যায়? হ্যাঁ, একটা জিনিস ফ্রি পাওয়া যায়, তা হচ্ছে চিকিৎসা। আপনাদের অবগতির জন্য বলি, এদেশে অনারারী বলে একটা বর্বর প্রথা রয়েছে। আর এই বর্বর প্রথা টা চিকিৎসক দের উপরই চাপিয়ে দেয়া হয়েছে।
যারা পোস্ট গ্রাজুয়েশন করবে, তাদের এই অনারারী করতে হয় সম্পূর্ন বিনা বেতনে। আই রিপিট একটা টাকা ও দেয়া হয়না তাদের। একবার চিন্তা করুন, যে বয়সে একজন চিকিৎসক এর অন্য বন্ধুরা, যারা অন্য প্রফেশন এ আছে, তারা লাখ টাকা বেতন পায়, বিদেশ এ ঘুরে ঠিক সেসময় সেই চিকিৎসক কে বিনা বেতনে দিনের পর দিন কামলা খাটতে হয়? এটা কি হতাশাজনক নয়?
আচ্ছা কোন ইঞ্জিনিয়ার কি ফ্রি তে আপনার বাড়ি র নকশা করে দিবে? কোন ব্যবসায়ী কি ফ্রিতে কিছু আপনার কাছে বিক্রি করবে? আচ্ছা খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানও তো চিকিৎসা র মত মৌলিক অধিকার। তাহলে আপনারা তো সেসব মৌলিক অধিকার ফ্রি তে পান না, কিন্তু চিকিৎসা তো ফ্রিতে পাচ্ছেন? তারপরও কেন চিকিৎসক এর উপর আপনার এত রাগ?
একজন চিকিৎসক সারাজীবন কষ্ট করে শেষ জীবন এ এসে, যদি আপনার কাছ থেকে ১০০০ টাকা ভিজিট নেন, তাহলে কি তা খুব দোষের কিছু হবে? সে তো আর এমনি টাকা নেয়না, আপনাকে চিকিৎসা করেই টাকা নেন।
এই আপনি, চিকিৎসক কে টাকা দিতে হাত কাপলো, কিন্তু এই আপনি ই কিন্তু হাজার টাকা খরচ করে, রেস্টুরেন্ট এ খান, লাখ টাকা ঘুষ দেন, ফাইল টা যাতে ছাড়ানো যায়, এই আপনি লাখ টাকা খরচ করেন, ভ্রমণ এর জন্য। জানেন গরীব মানুষগুলা না চিকিৎসক দের কসাই বলে না, বলে আপনাদের মত টাকা ওয়ালা কর্পোরেট ব্যবসায়ীরা।
আপনারা দেখেন, চিকিৎসকরা কলমের খোচায়, টাকা নেন। কিন্তু, এই টাকা নিতে যে রাতের ঘুম হারাম করতে হয়, দিনের পর দিন ফ্রি খাটতে হয়, পরিবার কে বঞ্চিত করতে হয় তা কেউ ই দেখে না।
এই গল্প গুলো তাই অসমাপ্ত ই রয়ে যায়। যা কেউ জানতে চায় না, বুঝতেও চায় না।।

শাহারিয়ার মাহমুদ

শিক্ষার্থী, এমএইচ শমরিতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। 

Monday, March 20, 2017

মহাকালের মহানায়কেরা

0 comments
১....
আমি তখন ঢাকা মেডিকেলে ইন্টার্নী করি, সার্জারীতে প্লেসমেন্ট।একটা জটিল অপারেশনে অ্যাসিস্ট করতে রাত ১ টায় ওটিতে ঢুকে যখন বের হই-তখন ফযরের আজান দিচ্ছে.....
সকাল ৮ টায় ওয়ার্ডে বসে ঝিমাতে ঝিমাতে রোগীর ফাইলের ফ্রেশ অর্ডার করছি, পাশের চেয়ারে বসে ডাঃ মাছুম ভাই আমাকে প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দিচ্ছেন।এমন সময় মাসুম ভাইয়ের ওয়াইফ( উনিও ডক্টর) ভাইয়াকে দেখতে ওয়ার্ডে আসলেন।কিছুক্ষণ কথা বলে আপু বিদায় নিলেন.....
ডাঃ মাছুম ভাইয়ের দেখলাম মন খারাপ।জিজ্ঞেস করলাম, "ভাই, কি হয়েছে?"....ভাই উত্তর দিলেন, "তোর আপুর সাথে আজ তিন দিন পর দেখা হলো, যেভাবে আমার আর তোর আপুর ডিউটি চলছে -তাতে আবার কবে দেখা হয় কে জানে...."
চিকিৎসকেরা বাস্তব জীবনে কিভাবে তাদের দিন যাপন করেন তার একটা ছোট নমুনা সেদিন আমি পেয়েছিলাম.....
২.....
ইন্টার্নী কমপ্লিট করে বিয়ে করে প্রোফেশনাল লাইফে ঢুকলাম।নিজেও ডক্টর, ওয়াইফও ডক্টর।দু'জনের ডিপার্টমেন্ট আলাদা.....
নিজে যেদিন একটু ফ্রি থাকি-সেদিন ওয়াইফের ডিউটি থাকে, যেদিন সে কিছুটা ফ্রি থাকে সেদিন আমার ডিউটি থাকে....
বাচ্চা বেশীর ভাগ সময়ে থাকে তার নানীর কাছে।অবস্থা এতটা বেগতিক যে কয়মাস আগে বাচ্চাকে কোলে নিতে গিয়ে দেখি আমার কোলে আসতে চায় না, মাঝে মাঝে আমাকে দেখতে পায়, চিনবেই বা কেমন করে?চোখের পানি আড়াল করলাম.....
সেদিন থেকে নিয়মিত এক কাজ করি, ডিউটিতে বা চেম্বারে ফ্রি হলে ভিডিও কল অন করে বাবুর সাথে কথা বলি....
৩....
গত ঈদের কথা বলি।আগেভাগে হাসপাতালের সব ইমার্জেন্সী ডিউটি করে ফেললাম,ঈদের সময়ের ডিউটিগুলো অন্য ধর্মের কলিগরা করবেন। প্ল্যান করলাম এইবারের ঈদে ফ্যামিলির সাথে বাসায় কাটাবো.....
এক্সপেক্টেড ঈদের আর একদিন বাকী, তার আগের দিন সরকারী ছুটি থাকে।খুশির আমেজ চারদিকে, ঐ ছুটির দিন ফ্যামিলির সবাই মিলে যমুনা ফিউচার পার্কে মার্কেটিংয়ে যাবো, অনেকদিন ঘুরতে যাওয়া হয় না....
ছুটির আগের দিন এক নোটিশ জারী করা হলো--সবার ছুটি থাকলেও সমস্ত চিকিৎসকদের ছুটি বাতিল করে হাসপাতালে থাকতে নির্দেশ দেয়া হলো। ঘটনাটা নিশ্চয়ই আপনাদের অনেকের মনে আছে....
হাসপাতালে যাবার জন্য রাস্তায় বের হলাম। সবাই ঈদের ছুটিতে বাড়ী যাচ্ছে, আনন্দ করছে, আমি সহ বাকী চিকিৎসকেদের রোগী দেখার জন্য সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে যেতে হয়েছিলো.....
৪....
সরকারী ভাবে সপ্তাহে একজন চিকিৎসকের ৩৯ ঘন্টা ডিউটি করার কথা। গত সপ্তাহের আগের সপ্তাহে আমাকে শুধু ইমার্জেন্সী ডিউটিই করতে হয়েছে ৪৮ ঘন্টা, আউটডোর ডিউটির হিসাব বাদ দিলাম....
৩৯ ঘন্টার পরিবর্তে যে অতিরিক্ত সময় আমি বা অন্য চিকিৎসকেরা হাসপাতালে কাটিয়েছি তা ছিলো Without a single penny.
একটা সাইডটক করি- আগ্রহী মন জানতে চায়---চিকিৎসক বাদে আর অন্য কোন্ প্রফেশনের ব্যক্তিরা এই অন্যায়টিকে কি কখনো মেনে নিবেন? অন্যায় ভাবে আমাদের দিয়ে খাটিয়ে নিয়ে জনগণকে যে চিকিৎসার মূলো দেখানো হয়-সেটি কি যুক্তিযুক্ত?....
মূল কথায় আসি, দিনের পর দিন আমরা দেশকে নির্ধারিত সময়ের বাইরেও অতিরিক্ত সেবা দিয়ে যাই।যদি কোনোদিন নিজের সন্তান আমাকে জিজ্ঞেস করে "কেনো তাকে সময় না দিয়ে বঞ্চিত করা হচ্ছে?"--তখন আমাদের জবাবটা কি হওয়া উচিত?
৫.....
আমার কথা বাদ দেই।আমার এক শ্রদ্ধেয় অধ্যাপকের ডেইলী রুটিনের নমুনা দেই....
স্যার সকাল ৮ টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত হাসপাতালে থেকে ওয়ার্ডে রাউন্ড দেন, গ্রাজুয়েট ও পোস্ট-গ্রাজুয়েট লেভেলের ছাত্রদের পড়ান, নানা একাডেমিক সেশনগুলোতে উপস্থিত থেকে আপডেটেড ইনফো অনুযায়ী প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দেন।আড়াইটার পর ক্লান্ত শরীরে বাসায় গিয়ে খাওয়া-দাওয়া, গোসল কমপ্লিট করে ঢাকার জ্যাম ঠেলে ঠিক ৫ টায় চেম্বারে ঢোকেন।রাত ১২-১ টা পর্যন্ত মানুষের প্রয়োজনে রোগী দেখেন।তারপর বাসায় যান, ঘুমটুম কি দেন জানি না, সকাল ৬ টায় রোগীর প্রয়োজনে এন্ডোসকপি শুরু করেন, সকাল ৮ টায় আবার হাসপাতালে ঢোকেন.....
কিভাবে এই লাইফ তিনি লীড করেন তা আপনারা কেউ কল্পনা করতে পারেন?
একটা তথ্য আমি আপনাদের দেই--এই দেশের অধিকাংশ অধ্যাপক ডক্টরকে মানুষের প্রয়োজনে কিছু রকমফের সাপেক্ষে এইরকম জীবনযাপনের প্যাটার্ন ফলো করতে হয়....
মানুষ চিকিৎসকদের টাকাটা দেখে, তার পেছনে মানুষের প্রয়োজনে নিজের জীবনটাকে যে উৎসর্গ করতে হচ্ছে-সেটা দেখে না.....
৬....
চিকিৎসকেরা কিভাবে তাদের দিনাতিপাত করে সেটার কিছু Example দিলাম।হাসপাতালে ও চেম্বার মিলিয়ে এদেশে অধিকাংশ চিকিৎসকদের কর্মঘন্টা সপ্তাহে ৬০ ঘন্টা বা তারও বেশী। সায়ন্টিফিক্যালি এটা কতটা Rational?
Lancet এ ২০১৫ সালে পাবলিশড্ হওয়া একটা Systematic Review এর তথ্য আপনাদের দেই।Lancet ও Systematic Review সম্পর্কে যাদের আইডিয়া আছে তাদেরকে এরপর এ স্টাডি নিয়ে আর কোনো কথা বলার তেমন কোনো কারণ দেখি না।তথ্যটা বলিঃ
৫,২৮,৯০৮ জন ব্যক্তির উপর প্রায় ৭ বছর স্টাডি চালিয়ে দেখা গেছে যারা সপ্তাহে ৫৫ ঘন্টা বা তার বেশী সময় ডিউটিতে কর্মরত থাকেন, তাদের Stroke রিস্ক সাধারণদের তুলনায় ৩৩ শতাংশ বেশী।৬,০৩,৮৩৮ জন ব্যক্তিকে নিয়ে ৮.৫ বছর সময়ে করা স্টাডিতে দেখা গেছে যাদের কর্মঘন্টা ৫৫ ঘন্টা বা তার বেশী তাদের Coronary Heart Disease এর রিস্ক ১৩ শতাংশ বেশী....
চিকিৎসকেরা আগে তার পরিবারের সদস্যদের বঞ্চিত করতেন, Lancet এর এই পাবলিকেশন তো বলে চিকিৎসকরা এখন নিজেরাও নিজেদের বঞ্চিত করছেন.....
৭....
লেখা দীর্ঘ হচ্ছে, শেষ করি.....
মেডিকেল সায়েন্সের যেকোনো বই পড়ার আগে তার ভূমিকা অংশটা আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ি।অধিকাংশ চিকিৎসকেরা বইটা লেখার পেছনে তাঁর পরিবারের অবদানের কথা উল্লেখ করেন, কেউ কেউ সরাসরি বইটি তার স্ত্রী বা সন্তানকে ডেডিকেট করেন। আমি এখন কিছুটা হলেও এর কারণটা বুঝতে পারি।এই ক্ষুদ্র জীবনে যাদেরকে দিনের পর দিন ঠকানো হয়েছে বই তো তাদের প্রতিই উৎসর্গ করা উচিত, সেটাই তো শোভনীয়.....
১২-১৪ বিলিয়ন বছর আগে Big Bang এর মাধ্যমে মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছিলো, এখনো মহাবিশ্ব টিকে আছে, আরো কত বিলিয়ন বছর টিকে থাকবে তা জানি না।তবে এতটুকু বলতে পারি মহাবিশ্ব যে মহাকাল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে আমাদের আয়ুষ্কাল তুচ্ছাতিতুচ্ছ.....
যে খনিক সময়টা আমরা পাই, সেটা আর কখনো ফিরে আসবে না, মহাকালের পাতায় আমরা মিশে যাবো।এই ক্ষুদ্র সময়ে অন্যরা যখন প্রিয়জনের সাথে খুনসুটিতে ব্যস্ত থাকে, আমরা চিকিৎসকেরা সে সময়ে আমাদের আপনজনদের বঞ্চিত করে অন্যের সেবা করার অভিপ্রায়ে ব্যস্ত থাকি।অন্যের মুখে হাসি ফোঁটাই, তা দেখে নিজেরা আনন্দিত হই, নিজের প্রিয়জনদের বঞ্চিত করার যে দীর্ঘশ্বাস তা নিজেদের সাথে মহাকালের পাতায় বিলীন হয়। মহাকালের মহানায়কদের সে দুঃখ কাউকে স্পর্শ করে না, কেউ অবশ্য সেটা জানতেও পারে না....

লিখেছেনঃ  জামান অ্যালেক্স

Sunday, April 14, 2013

A Textbook of Clinical Pharmacology and Therapeutics

0 comments
 
A Textbook of Clinical Pharmacology and Therapeutics 5th Edition






Book Details

Author: James M. Ritter, Lionel D. Lewis, Timothy G. K. Mant, Albert Ferro
Publisher:Hodder Arnold Publishers, 2008
ISBN: 0340900466, 9780340900468
Length: 476 Pages
Edition: 5th
File Format: PDF
File Size: 13.6 MB


 
 

| Medical Science © 2013. All Rights Reserved | Design by Md.Mahbubul Islam |